চট্টগ্রাম বন্দরে শাটডাউন ঘোষণা শ্রমিক-কর্মচারীদের

এনসিটির চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা রিট হাইকোর্টে খারিজ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি-সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি-সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চ গতকাল এ রায় ঘোষণা করেন। এর ফলে চুক্তিটি নিয়ে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না বলে ভাষ্য আইনজীবীদের।

এদিকে রিট খারিজের সংবাদ প্রকাশের পর আগামীকাল শনি ও রোববার চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় দুইদিনের শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। দাবি আদায় না হলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, এনসিটির বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠায় তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক টার্মিনাল বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়ার উদ্যোগ দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এনসিটি চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে করা রিট আবেদনের ওপর গত বছরের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত রায় দেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুল অ্যাবসলিউট ঘোষণা করলেও অপর বিচারপতি রুল ডিসচার্জ করেন। পরে গত ১৫ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান।

এদিকে রায় ঘোষণার পর রিট আবেদনকারীর আইনজীবীরা জানান, হাইকোর্টে রিট খারিজ হলেও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘হাইকোর্ট রিট খারিজ করলেও আদালত বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ আপিল নিষ্পত্তির আগে কোনো চুক্তি কার্যকর করা যাবে না।’

ঘোষিত রায়ে বলা হয়, দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক আইনগতভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। রায়ে আরো উল্লেখ করা হয়, যে প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম এগোচ্ছে তা ২০১৭ সালের প্রকিউরমেন্ট পলিসি ও সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারকের আওতায় রয়েছে। এসব নীতিমালায় সরাসরি নির্বাচন বা দরপত্রের সুযোগ রয়েছে এবং আইনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এখানে কোনো আইনগত চ্যালেঞ্জ করা হয়নি এবং এখনো কাউকে কার্যাদেশ দেয়া হয়নি বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক শুনানিতে অংশ নেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী মো. হেলাল উদ্দিন চৌধুরী ও বার্থ অপারেটর এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিমের পক্ষে আইনজীবী নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম শুনানি করেন।

রায়ের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘২০১৫ সালের পিপিপি অ্যাক্ট, ২০১৭ সালের জিটুজি পলিসি এবং ২০১৮ সালের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ করেই প্রক্রিয়া এগিয়েছে। এখানে আইনবহির্ভূত কিছু নেই। ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারেরই একটি প্রতিষ্ঠান।’

এদিকে গতকাল দুপুর থেকেই চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের ভেতরে ‘গো ব্যাক ডিপি ওয়ার্ল্ড’ স্লোগানে শ্রমিকরা টানা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এনসিটি বিষয়ে বন্দরে বোর্ড সভা চলাকালেও ‘অবৈধ বোর্ড মিটিং মানি না, মানব না’সহ নানা স্লোগান দেন তারা।

আন্দোলনকারীরা জানান, কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। রোববার একই সময়ে প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে। এ সময় পণ্য ওঠানামা, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও জাহাজ থেকে পণ্য খালাসসহ সব কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে বর্তমান বন্দর বোর্ড বাতিল ও জাতীয় সম্পদ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা বা হস্তান্তর না করা।

চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও সাবেক সিবিএ নেতা মো. হুমায়ুন কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শনিবার থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত স্তব্ধ করে দেয়া হবে। আমাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করার দায় সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। লাভজনক একটি টার্মিনাল কেন বিনা দরপত্রে বিদেশী কোম্পানিকে দেয়া হবে, আমরা তা কোনোভাবেই মেনে নেব না।’

শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় গতকাল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনিক ভবন, কারশেড ও বিভিন্ন প্রবেশপথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করার সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিগত পর্যায়ের বিষয়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনসিটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করার বিষয়টি আধুনিকায়ন, বিদেশী বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখেই বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।’

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, এনসিটি বিদেশী অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে পিপিপি কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক সই হয়। সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার জিটুজি ভিত্তিতে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেয়। এ উদ্যোগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন গত বছর উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন।

বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। বিদেশী অপারেটরের কাছে হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি এনসিটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে।

আরও